» একে একে ভেঙে পড়ল সেতুর সাত গার্ডার

প্রকাশিত: ২৩. মে. ২০২৬ | শনিবার

লোকেরা বলছেন গার্ডার ভাঙ্গা নয় এটা লাখো মানুষের স্বপ্ন ভেঙ্গে পড়ছে। । সুনামগঞ্জবাসীর বহুদিনের স্বপ্ন থমকে গেছে। বিশ্বম্ভরপুর-মহেষখলা-মধ্যনগর সংযোগ সড়কের (সীমান্ত সড়ক) কাজে সেতুর জন্য অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। এই সড়কপথের যাদুকাটা নদীর ওপর প্রায় শতকোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন সেতুর (শাহ আরেফিন (রা.)-অদ্বৈত মহাপ্রভু মৈত্রী সেতু) গার্ডার দুই বছরের মধ্যে দুইবার ভেঙে পড়েছে। সব মিলিয়ে সাতটি গার্ডার ভাঙায় উৎকণ্ঠিত এলাকাবাসী।

আশঙ্কা করা হচ্ছে, সীমান্তের বড় বালুমহাল হিসেবে পরিচিত যাদুকাটার এই সেতুর অন্য গার্ডারগুলোও ভেঙে পড়তে পারে। দুর্ঘটনা ঘটলে এখান দিয়ে যাওয়া শত শত নৌকার শ্রমিকরা বিপদে পড়তে পারেন।
এলজিইডির এক কর্মকর্তা বললেন, এর চেয়ে গভীর ও খরস্রোতা নদীতে সুনামগঞ্জে অনেক সেতু হয়েছে। এভাবে বারবার গার্ডার ভেঙে পড়ার নজির নেই। এই সেতুর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তমা কনস্ট্রাকশনের মালিক আতাউর রহমান ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দেশ ছেড়েছেন। এরও বহু আগে থেকে সেতুর নির্মাণকাজ বন্ধ ছিল, কিন্তু এলজিইডি কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। সম্প্রতি ঠিকাদার বাতিল করে পুনরায় অসমাপ্ত কাজের জন্য দরপত্র আহ্বানের প্রক্রিয়া শুরু হয়। তবে সোমবার বিকেলে পাঁচ গার্ডার ভাঙার পর এই প্রক্রিয়া থমকে গেছে। আবার নতুন করে ওই পাঁচ গার্ডারসহ ব্যয়ের প্রাক্কলন তৈরি করতে হবে।
এলজিইডির একজন প্রকৌশলী জানান, পল্লি সড়ক নির্মাণ প্রকল্পের আওতায় ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে প্রায় ৮৬ কোটি টাকা ব্যয়ে সেতুটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান রাজধানীর তমা কনস্ট্রাকশন একাধিক দফায় সময় বাড়িয়েও আট বছরে কাজ শেষ করতে পারেনি। সেতুর ৭৫টি গার্ডারের মধ্যে এখনও ১৮ ডি গার্ডার ও পাঁচটি স্লাবের কাজ বাকি রয়েছে। এরমধ্যেই দুই দফায় সাতটি গার্ডার ভেঙে পড়েছে।

তমা কনস্ট্রাকশনের মালিক আতাউর রহমান মানিক নোয়াখালীর বাসিন্দা। বিগত সরকারের সময়ে মন্ত্রী মির্জা আজমের ঘনিষ্ঠ হিসেবে এলজিইডি সদরদপ্তরে পরিচিত ছিলেন। এই সেতু এবং একই পথের মধ্যনগরের সোমেশ্বরী সেতু ও তাহিরপুরের ডাম্পের বাজার সেতুর কাজও পেয়েছিল এই প্রতিষ্ঠান। আট বছরেও শেষ হয়নি এসব সেতুর কাজ। ওই সেতুগুলোর কাজেও অনিয়মের অভিযোগ আছে স্থানীয় বাসিন্দাদের।

অনেকে বলছেন, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিক দেশ ছেড়ে কানাডা চলে গেছেন। এলজিইডি কেবল ঠিকাদার বাতিল করে নতুন করে দরপত্র আহ্বান করেছে। এই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনি কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি।
স্থানীয়রা বলছেন  ‘সেতুর গার্ডার এক এক করে দুবারে সাতটি পড়ে গেছে। এই সেতু ভেঙে ফেলা উচিত। গার্ডার ভাঙার পর এলজিইডির কর্মকর্তারা যে দায়িত্বজ্ঞানহীন বক্তব্য দিয়েছেন, তাতেও ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।’

মঙ্গলবার সেতু এলাকায় গেলে ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী জানান, অনেক স্বপ্ন ছিল তাদের। অথচ আট বছর ধরে ঝুলিয়ে রেখে কেবল টাকা লুটপাট হয়েছে। কাজের কাজ কিছুই হয়নি। সেতুর দুই বছরের মধ্যে দুইবার গার্ডার ভেঙে পড়ল। কাজে অবহেলা এবং অনিয়ম না থাকলে এটি হতো না। তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘নির্মাণ ত্রুটির কারণে এমনটি হচ্ছে। এখন সেতু নির্মাণকাজ আরও পেছাবে।’

তমা কনস্ট্রাকশনের ম্যানেজার আনিসুর রহমানের মোবাইল ফোনে কল দিলে তিনি বলেন, সেতুর বিষয়ে তাঁর কাছে কোনো তথ্য নেই। এ বিষয়ে জানতে চাইলে এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলীকে ফোন দিতে পরামর্শ দিয়ে লাইন কেটে দেন আনিসুর। এরপর আর কল রিসিভ করেননি।

সুনামগঞ্জ এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেন বলেন, যাদুকাটা সেতুর আগের নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানকে বাতিল করে নতুন করে দরপত্র আহবানের প্রক্রিয়া শেষ পর্যায়ে ছিল। ১৯ কোটি ৮০ লাখ টাকা ব্যয়ের এই দরপত্র প্রস্তুত করা হয়। এখন দুই কোটি বাড়িয়ে আবার দরপত্র প্রস্তুত করা হবে। প্রস্তুত করতে এক মাস সময় লাগবে। যে গার্ডারগুলো ভেঙেছে, সেগুলো নির্মাণ করতে ৮-৯ মাস সময় বেশি লাগবে। কাজে অনিয়মের বিষয়ে অভিযোগ সঠিক নয় দাবি করে এই প্রকৌশলী বলেন, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান গার্ডারগুলো করার সময় ক্লোজ গার্ডার করলে, এমন হতো না। এ কারণে তাদের পাওনা টাকা থেকে মোট দুই কোটি ১০ লাখ টাকা কর্তন করা হবে।

সোমেশ্বরী ও ডাম্পের বাজার সেতুর কাজও শেষ হয়নি
এই সীমান্ত পথেই সোমেশ্বরী নদীর ওপর ৪২ কোটি টাকা ব্যয়ের আরেকটি সেতুর কাজও তমা কনস্ট্রাকশনের লোকজন শেষ না করে এলাকা ছেড়েছে। এটিরও নতুন করে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। ৪৭ কোটি টাকা ব্যয়ে করা ডাম্পের বাজার সেতুর অ্যাপ্রোচ সড়কও এই প্রতিষ্ঠান করেনি। এই সেতুর কাজে তমা কনস্ট্রাকশনকে বাতিলের প্রস্তাব সম্প্রতি পাঠিয়েছে এলজিইডি।

[hupso]